Skip to content

হেপাটাইটিস বি ও সি পরীক্ষা (দাঁতের অপারেশনের আগে)

হেপাটাইটিস বি ও সি পরীক্ষা (দাঁতের অপারেশনের আগে)
Rate this post

দাঁতের অপারেশন মানেই সামান্য হলেও রক্তপাত। আর হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসের প্রধান ছড়ানোর পথ এই রক্তই। তাই অপারেশনের আগে হেপাটাইটিস পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া শুধু চিকিৎসকের নিরাপত্তার বিষয় নয়—আপনার নিজের জন্যও এটি একটি বুদ্ধিমান সতর্কতা।

বাংলাদেশে অনেক ডেন্টাল ক্লিনিক বা দন্তচিকিৎসক এই পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করেন না। কিন্তু পরীক্ষাটি করালে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন যে আপনার চিকিৎসা এমন সতর্কতার মধ্যে হচ্ছে, যা সংক্রমণ ছড়ানো রোধ করে। নিচে জেনে নিন—কেন এই পরীক্ষা জরুরি, কোন কোন পরীক্ষা করা হয়, ফলাফল পজিটিভ এলে কী করবেন এবং খরচ কেমন।

দাঁতের অপারেশনের আগে কেন হেপাটাইটিস পরীক্ষা জরুরি?

দাঁত তোলা, মাড়ির অস্ত্রোপচার, রুট ক্যানেল বা ইমপ্লান্ট—প্রায় প্রতিটি ডেন্টাল অপারেশনের সময় রক্ত বের হয়। রোগীর শরীরে যদি হেপাটাইটিস বি বা সি ভাইরাস থাকে, তাহলে সেই রক্তের মাধ্যমে ভাইরাসটি যন্ত্রপাতি, গ্লাভস বা চিকিৎসকের হাতে লেগে যেতে পারে। যন্ত্রপাতি ঠিকমতো জীবাণুমুক্ত না হলে পরবর্তী রোগীরও সংক্রমণ হতে পারে।

বিশেষ করে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস অনেক দিন বাইরের পরিবেশে বেঁচে থাকতে পারে। বাংলাদেশে আনুমানিক ৫–৭% মানুষের শরীরে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস থাকতে পারে এবং ১–২% মানুষের মধ্যে হেপাটাইটিস সি সংক্রমণ থাকতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে তারা সংক্রমিত। তাই অপারেশনের আগে পরীক্ষা করালে চিকিৎসক আগেই ঝুঁকিটি বুঝতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা নিতে পারেন।

কী কী পরীক্ষা করা হয়? (HBsAg ও Anti-HCV)

দাঁতের অপারেশনের আগে সাধারণত দুটি রক্ত পরীক্ষা করা হয়:

  • HBsAg (হেপাটাইটিস বি সারফেস অ্যান্টিজেন): এই পরীক্ষায় বোঝা যায় আপনার শরীরে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস আছে কি না। রিপোর্ট পজিটিভ এলে অর্থাৎ ভাইরাসটি বর্তমানে শরীরে সক্রিয় আছে।
  • Anti-HCV (হেপাটাইটিস সি অ্যান্টিবডি): এই পরীক্ষায় বোঝা যায় আপনার শরীরে হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কি না। পজিটিভ এলে বোঝায় আপনি কোনো না কোনো সময় ভাইরাসটির সংস্পর্শে এসেছেন; বর্তমানে সংক্রমণ আছে কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও পরীক্ষার (যেমন HCV RNA) প্রয়োজন হতে পারে।

পরীক্ষার জন্য শুধু রক্তের নমুনা দিতে হয়—হাতের শিরা থেকে কয়েক মিলিলিটার রক্ত নেওয়া হয়। খালি পেটে যাওয়ার দরকার নেই। বেশিরভাগ ল্যাবে ২৪–৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রিপোর্ট পাওয়া যায়।

পরীক্ষার ফলাফল পজিটিভ এলে কী করবেন?

সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাটি হলো—রিপোর্ট পজিটিভ এলে দাঁতের চিকিৎসা একেবারে বন্ধ করে দেওয়া। আসলে ব্যাপারটি মোটেও তা নয়। পজিটিভ রিপোর্ট মানে চিকিৎসক আগে থেকে জানতে পারলেন এবং সেই অনুযায়ী সতর্কতা নিতে পারলেন।

  • চিকিৎসক দ্বিগুণ গ্লাভস, মাস্ক ও চোখের সুরক্ষা (গগলস) ব্যবহার করবেন।
  • যন্ত্রপাতি আলাদাভাবে জীবাণুমুক্ত করা হবে বা সম্ভব হলে ডিসপোজেবল যন্ত্র ব্যবহার করা হবে।
  • অপারেশনের সময় যেন অন্য রোগীর সঙ্গে কোনো যন্ত্র বা পৃষ্ঠতল ভাগ না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা হবে।
  • ব্যবহৃত গ্লাভস, গজ ও সুই বিশেষ নিয়মে ফেলা হবে।

আপনার নিজের জন্যও পজিটিভ রিপোর্ট একটি সংকেত—লিভার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। হেপাটাইটিস বি বা সি দীর্ঘমেয়াদে লিভারের ক্ষতি করতে পারে, তাই শুধু দাঁতের চিকিৎসার জন্যই নয়, সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্যও একজন চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকা দরকার।

হেপাটাইটিস বি ও সি পরীক্ষার ফলাফল ও করণীয়
পরীক্ষা ফলাফল এর অর্থ কী দাঁতের ডাক্তারের করণীয়
HBsAg Negative হেপাটাইটিস বি ভাইরাস শনাক্ত হয়নি স্বাভাবিক পদ্ধতিতে চিকিৎসা
HBsAg Positive ভাইরাসটি শরীরে সক্রিয় আছে দ্বিগুণ গ্লাভস, বিশেষ জীবাণুমুক্তকরণ ও বর্জ্য নিষ্পত্তি
Anti-HCV Negative হেপাটাইটিস সি অ্যান্টিবডি পাওয়া যায়নি স্বাভাবিক পদ্ধতিতে চিকিৎসা
Anti-HCV Positive ভাইরাসের সংস্পর্শে এসেছেন; নিশ্চিত হতে HCV RNA পরীক্ষা লাগতে পারে সতর্কতা অবলম্বন; প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ

বাংলাদেশে পরীক্ষার খরচ কত?

বাংলাদেশে এই পরীক্ষাগুলোর খরচ তুলনামূলকভাবে কম। শহর, ল্যাবের মান ও প্যাকেজ অনুযায়ী দাম কিছুটা কম-বেশি হতে পারে। নিচে একটি মোটামুটি ধারণা দেওয়া হলো:

বাংলাদেশে হেপাটাইটিস বি ও সি পরীক্ষার আনুমানিক খরচ
পরীক্ষার নাম আনুমানিক খরচ (টাকা) বিবরণ
HBsAg (হেপাটাইটিস বি) ২০০–৪০০ টাকা সাধারণ স্ক্রিনিং পরীক্ষা
Anti-HCV (হেপাটাইটিস সি) ৩০০–৬০০ টাকা অ্যান্টিবডি শনাক্তকরণ পরীক্ষা
দুটি একসঙ্গে (কম্বো প্যাকেজ) ৫০০–৮০০ টাকা অনেক ল্যাবে একসঙ্গে করালে খরচ কিছুটা কম হয়

দ্রষ্টব্য: সরকারি হাসপাতালে খরচ আরও কম হতে পারে। তবে দাম যেকোনো সময় বদলাতে পারে, তাই পরীক্ষা করানোর আগে ল্যাব থেকে বর্তমান মূল্য জেনে নেওয়া ভালো।

কোথায় ও কীভাবে পরীক্ষা করাবেন?

বাংলাদেশের যেকোনো বড় ডায়াগনস্টিক ল্যাব, বেসরকারি হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগ বা সরকারি হাসপাতালে এই পরীক্ষা করানো যায়। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ জেলা সদরগুলোতে কমার্শিয়াল ল্যাবগুলোতে সাধারণত কোনো রেফারেল ছাড়াই এই পরীক্ষা করা হয়।

প্রক্রিয়াটি খুব সহজ:

  1. ল্যাবে গিয়ে HBsAg ও Anti-HCV পরীক্ষার কথা বলুন।
  2. রক্তের নমুনা দিন—খালি পেটের প্রয়োজন নেই।
  3. নির্দিষ্ট সময়ে রিপোর্ট সংগ্রহ করুন; অনেক ল্যাবে অনলাইনেও রিপোর্ট পাওয়া যায়।
  4. অপারেশনের আগে রিপোর্টটি দাঁতের ডাক্তারকে দেখান।

অনেক ল্যাবে বাসা থেকে নমুনা সংগ্রহের সুবিধাও আছে। তবে নিশ্চিত হয়ে নিন যে ল্যাবটি স্বীকৃত এবং রিপোর্ট নির্ভরযোগ্য।

বিভাগ অনুযায়ী ডেন্টিস্ট ও ডেন্টাল ক্লিনিক

পরীক্ষা করিয়ে নেওয়ার পর দাঁতের চিকিৎসার জন্য আপনার এলাকার ডেন্টিস্ট বা ডেন্টাল ক্লিনিক খুঁজে নিতে পারেন।

বিভাগ ডেন্টিস্ট ডেন্টাল ক্লিনিক
Dhaka ঢাকায় ডেন্টিস্ট খুঁজুন ঢাকায় ডেন্টাল ক্লিনিক খুঁজুন
Chattogram চট্টগ্রামে ডেন্টিস্ট খুঁজুন চট্টগ্রামে ডেন্টাল ক্লিনিক খুঁজুন
Khulna খুলনায় ডেন্টিস্ট খুঁজুন খুলনায় ডেন্টাল ক্লিনিক খুঁজুন
Rajshahi রাজশাহীতে ডেন্টিস্ট খুঁজুন রাজশাহীতে ডেন্টাল ক্লিনিক খুঁজুন
Rangpur রংপুরে ডেন্টিস্ট খুঁজুন রংপুরে ডেন্টাল ক্লিনিক খুঁজুন
Sylhet সিলেটে ডেন্টিস্ট খুঁজুন সিলেটে ডেন্টাল ক্লিনিক খুঁজুন
Barishal বরিশালে ডেন্টিস্ট খুঁজুন বরিশালে ডেন্টাল ক্লিনিক খুঁজুন
Mymensingh ময়মনসিংহে ডেন্টিস্ট খুঁজুন

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

দাঁতের অপারেশনের আগে হেপাটাইটিস বি ও সি পরীক্ষা করানো কি বাধ্যতামূলক?

বাংলাদেশে বর্তমানে কোনো আইন বা নীতিমালা নেই যা দাঁতের অপারেশনের আগে এই পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করেছে। তবে অধিকাংশ ডেন্টাল সার্জন ও ক্লিনিক এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন এবং অনেক ক্ষেত্রে নিজ থেকেই পরীক্ষা করিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেন। এমনকি আপনার চিকিৎসক না চাইলেও আপনি নিজেই পরীক্ষাটি করিয়ে নিতে পারেন—এটি আপনার ও চিকিৎসক উভয়ের জন্যই একটি সুরক্ষা ব্যবস্থা। তাই বাধ্যতামূলক না হলেও বুদ্ধিমানের কাজ হলো অপারেশনের কমপক্ষে ২-৩ দিন আগে পরীক্ষাটি করে নেওয়া।

পরীক্ষার রিপোর্ট নেগেটিভ এলে কি পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায় যে আমার হেপাটাইটিস নেই?

না, সম্পূর্ণ নিশ্চিত হওয়া যায় না। HBsAg ও Anti-HCV পরীক্ষা সাধারণত বর্তমান বা দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণ শনাক্ত করতে পারে, কিন্তু ভাইরাস শরীরে ঢোকার পর কয়েক সপ্তাহ (উইন্ডো পিরিয়ড) পর্যন্ত পরীক্ষায় ধরা নাও পড়তে পারে। এছাড়া অন্যান্য হেপাটাইটিস ভাইরাসও (যেমন হেপাটাইটিস এ, ই) আছে যা এই পরীক্ষায় ধরা পড়ে না। তাই নেগেটিভ রিপোর্ট ভালো খবর, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে আপনি ভাইরাসমুক্ত—বিশেষ করে যদি সম্প্রতি কোনো ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ (যেমন অসুস্থ সুই ব্যবহার, অসুরক্ষিত যৌন সম্পর্ক) থেকে থাকে। তবে পরীক্ষার সময়সীমা অনুযায়ী সাধারণত অবস্থা পরিষ্কার হয়, এবং নেগেটিভ এলে চিকিৎসক স্বাভাবিক সতর্কতার সাথে অপারেশন করতে পারেন।

যদি পরীক্ষার ফল পজিটিভ আসে, তাহলে কি দাঁতের অপারেশন বাতিল করতে হবে? কীভাবে নিরাপদে অপারেশন সম্ভব?

পজিটিভ ফল মানেই অপারেশন বাতিল করতে হবে না, বরং কিছু অতিরিক্ত সতর্কতা নেওয়া প্রয়োজন। আপনার ডেন্টাল সার্জনকে ফলাফলের বিষয়ে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে—তিনি তাহলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করবেন, যেমন জীবাণুনাশক যথাযথ ব্যবহার, দস্তানা ও মাস্ক পরিবর্তন, এবং রক্ত-দূষিত উপাদান আলাদা করে ফেলা। এছাড়া আপনার যদি হেপাটাইটিস বি-এর উপসর্গ বা লিভার সমস্যা থাকে, তবে চিকিৎসক অপারেশনের আগে হেপাটোলজিস্টের পরামর্শ নিতে পারেন। মনে রাখবেন, সঠিক সতর্কতায় ভাইরাস অন্যদের মধ্যে ছড়ানো রোধ করা সম্ভব, এবং আপনার অপারেশনও নিরাপদে সম্পন্ন করা যায়। তবে কোনো অবস্থায়ই নিজে থেকে ওষুধ শুরু করবেন না বা অপারেশন বাতিলের সিদ্ধান্ত নিজে নেবেন না—সর্বদা চিকিৎসকের সাথে আলোচনা করুন।

তথ্যসূত্র

উপরের তথ্যসূত্রগুলো আন্তর্জাতিক জার্নাল, সরকারি স্বাস্থ্য সংস্থা বা স্বীকৃত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া:

Rate this post