Skip to content

মুখের ভেতর ঘা হওয়ার কারণ?

মুখের ভেতর ঘা হওয়ার কারণ?
Rate this post

মুখের ভেতর ঘা (মাউথ আলসার) একটি খুব সাধারণ সমস্যা। অনেকেই এটাকে তেমন গুরুত্ব দেন না, কিন্তু এর কারণ হালকা কিছু থেকে শুরু করে গুরুতর রোগ পর্যন্ত হতে পারে। এই গাইডে আমরা জানব কেন মুখে ঘা হয়, কোন ধরনের ঘা সাধারণত ক্ষতিকর, আর কখন সতর্ক হয়ে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি। উদ্দেশ্য হলো আপনাকে উদ্বেগ না বাড়িয়ে সঠিক তথ্য দেওয়া, যাতে আপনি নিজেই বুঝতে পারেন কখন দরকার পেশাদার পরামর্শ।

মুখের ভেতর ঘা বলতে আসলে কী বোঝায়?

মুখের ভেতরের ঘা বা আলসার হলো মুখের ভেতরের আস্তরণে (মিউকোসা) সৃষ্টি হওয়া ছোট বা বড় ক্ষত। এগুলো গালের ভেতর, জিহ্বা, ঠোঁটের ভেতর, মাড়ি বা তালুতে হতে পারে। বেশিরভাগ ঘাই ব্যথাযুক্ত এবং খাওয়া-দাওয়া বা কথা বলায় অসুবিধা করে। তবে সব ঘা এক রকম নয়—কিছু কয়েক দিনে সেরে যায়, কিছু বারবার ফিরে আসে, আর কিছু দীর্ঘস্থায়ী হয়। তাই ঘা দেখলেই আতঙ্কিত না হয়ে এর ধরন ও সময়কাল বোঝা জরুরি।

সাধারণ কারণগুলো কী কী?

দৈনন্দিন জীবনে অনেক কারণে মুখে ঘা হতে পারে। নিচে কয়েকটি সাধারণ কারণ উল্লেখ করা হলো:

  • শারীরিক আঘাত: দাঁত দিয়ে গাল বা জিহ্বা কামড়ে ফেলা, শক্ত ব্রাশ করা, দাঁতের ধারালো অংশ বা ভাঙা দাঁতের ঘষা লেগে ঘা হতে পারে।
  • গরম বা অম্লজাতীয় খাবার: অতিরিক্ত গরম চা-কফি, ঝাল বা টক খাবার মুখের ভেতরের টিস্যু পুড়িয়ে বা জ্বালা করে ঘা তৈরি করতে পারে।
  • মানসিক চাপ ও ক্লান্তি: স্ট্রেস বা পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, ফলে ঘা দেখা দিতে পারে।
  • ভিটামিন ও খনিজের অভাব: ভিটামিন বি১২, আয়রন, ফোলেট বা জিঙ্কের অভাবে বারবার মুখের ঘা হতে পারে।
  • হরমোনের পরিবর্তন: নারীদের মাসিকের সময় বা গর্ভাবস্থায় হরমোনের ওঠানামায় কিছু মানুষের মুখে ঘা হয়।
  • অ্যালার্জি বা সংবেদনশীলতা: টুথপেস্ট, মাউথওয়াশ বা কিছু খাবারের প্রতি অ্যালার্জির কারণেও ঘা হতে পারে।

সংক্রমণের কারণে মুখে ঘা হতে পারে?

হ্যাঁ, ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা ফাঙ্গাসের সংক্রমণের কারণেও মুখে ঘা হতে পারে। নিচের টেবিলে সাধারণ সংক্রমণজনিত ঘাগুলোর ধরন, কারণ ও করণীয় তুলে ধরা হলো:

ঘার ধরন সাধারণ কারণ যেমন দেখতে লাগে করণীয়
ক্যানকার সোর (অ্যাফথাস আলসার) স্ট্রেস, আঘাত, ভিটামিনের অভাব, অটোইমিউন প্রতিক্রিয়া গোলাকার বা ডিম্বাকৃতি, সাদা/হলুদ কেন্দ্র, লাল রিম, সাধারণত গালের ভেতর বা জিহ্বায় হয় বেশিরভাগ নিজে সেরে যায়; ব্যথা কমাতে ঠান্ডা খাবার, লবণ পানি কুলি
কোল্ড সোর (ঠোঁটের হারপিস) হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস (HSV-1) ঠোঁটের কোণে বা আশপাশে ছোট ছোট ফোস্কা, জ্বালা, চুলকানি ভাইরাসজনিত, সংক্রামক; সাধারণত ৭-১০ দিনে সেরে যায়; বারবার হলে ডাক্তার দেখান
ওরাল থ্রাশ (ফাঙ্গাল ইনফেকশন) ক্যান্ডিডা ফাঙ্গাস, সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিক বা ডায়াবেটিসের কারণে সাদা ক্রিমের মতো দাগ যা মুছে ফেললে লাল হয়ে যায়, জিহ্বা ও গালে বেশি হয় অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ প্রয়োজন; ডাক্তারের পরামর্শ নিন
ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন স্ট্রেপ্টোকক্কাস বা অন্যান্য ব্যাকটেরিয়া লাল, ফোলা, পুঁজযুক্ত ঘা, জ্বর থাকতে পারে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন; দ্রুত ডাক্তার দেখান

কোন রোগের লক্ষণ হিসেবে মুখের ঘা হতে পারে?

কিছু জটিল রোগের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে মুখের ঘা দেখা দিতে পারে। এগুলো তুলনামূলক বিরল, তবে দীর্ঘস্থায়ী বা বারবার ফেরা ঘা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। যেমন:

  • বেহচেট ডিজিজ: এটি একটি অটোইমিউন রোগ যেখানে মুখ ও যৌনাঙ্গে বারবার ঘা হয়, চোখ ও ত্বকেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।
  • লুপাস (SLE): মুখের ঘা লুপাসের একটি সাধারণ লক্ষণ, বিশেষ করে তালুতে ব্যথাহীন ঘা হতে পারে।
  • প্রদাহজনিত অন্ত্রের রোগ (IBD): ক্রোনস ডিজিজ বা আলসারেটিভ কোলাইটিসের সাথে মুখের ঘা সম্পর্কিত হতে পারে।
  • লাইকেন প্ল্যানাস: মুখের ভেতরে সাদা জালের মতো দাগ বা ঘা তৈরি করে, যা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

মনে রাখবেন, এই রোগগুলো খুবই বিরল। তবে যদি আপনার ঘা ২ সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়, বারবার ফিরে আসে, বা অন্য কোনো উপসর্গ (যেমন জ্বর, ওজন কমা, চোখের সমস্যা) থাকে, তবে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হন।

কোন ঘা নিয়ে দ্রুত ডাক্তার দেখাবেন?

বেশিরভাগ মুখের ঘা নিজে নিজে সেরে গেলেও কিছু লক্ষণ আছে যেগুলো উপেক্ষা করা উচিত নয়। নিচের টেবিলে দেখুন কখন দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি:

লক্ষণ সম্ভাব্য কারণ ডাক্তার দেখানোর জরুরি অবস্থা
২ সপ্তাহের বেশি স্থায়ী ঘা দীর্ঘস্থায়ী আলসার, ক্যানসারের সম্ভাবনা (বিরল) হ্যাঁ, দেরি না করে ডেন্টিস্ট বা ইএনটি বিশেষজ্ঞ দেখুন
দ্রুত বড় হওয়া বা ছড়িয়ে পড়া সংক্রমণ বা টিউমার হ্যাঁ, জরুরি
ব্যথাহীন ঘা ক্যানসার বা অটোইমিউন রোগের লক্ষণ হতে পারে হ্যাঁ, বিশেষ করে যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়
বারবার ফিরে আসা ঘা পুষ্টির অভাব, অটোইমিউন রোগ, বা দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ হ্যাঁ, কারণ নির্ণয় প্রয়োজন
জ্বর, ওজন কমা, গলায় লিম্ফ নোড ফোলা সিস্টেমিক সংক্রমণ বা ক্যানসার হ্যাঁ, দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান

বিভাগ অনুযায়ী ডেন্টিস্ট ও ডেন্টাল ক্লিনিক

যদি আপনার মুখের ঘা দীর্ঘস্থায়ী হয় বা সঠিক কারণ বোঝা না যায়, তাহলে একজন ডেন্টিস্টের পরামর্শ নেওয়া ভালো। নিচে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিভাগে ডেন্টিস্ট ও ডেন্টাল ক্লিনিকের তালিকা দেওয়া হলো:

বিভাগ ডেন্টাল তালিকা
ঢাকা ঢাকায় যাচাইকৃত ডেন্টিস্ট
চট্টগ্রাম চট্টগ্রামে জনপ্রিয় ডেন্টিস্ট
খুলনা খুলনায় যাচাইকৃত ডেন্টিস্ট
রাজশাহী রাজশাহীতে জনপ্রিয় ডেন্টিস্ট
রংপুর রংপুরে যাচাইকৃত ডেন্টিস্ট
সিলেট সিলেটে ডেন্টিস্ট খুঁজুন
বরিশাল বরিশালে ডেন্টিস্ট
ময়মনসিংহ ময়মনসিংহে দাঁতের ডাক্তার

ঘরোয়া যত্ন ও প্রতিরোধে কী করবেন?

মুখের ঘা থেকে দ্রুত আরাম পেতে এবং ভবিষ্যতে প্রতিরোধ করতে কিছু সাধারণ ঘরোয়া পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেন:

  • খাবার ও পানীয়: ঠান্ডা বা হালকা গরম খাবার খান। ঝাল, টক, খুব গরম বা শক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন।
  • মুখের পরিচ্ছন্নতা: নরম ব্রাশ ব্যবহার করুন এবং নিয়মিত দাঁত ব্রাশ করুন। অ্যালকোহলযুক্ত মাউথওয়াশ এড়িয়ে চলুন।
  • লবণ পানি কুলি: হালকা গরম পানিতে লবণ মিশিয়ে দিনে ২-৩ বার কুলি করলে ব্যথা কমে এবং সংক্রমণ প্রতিরোধ হয়।
  • পানি পান: পর্যাপ্ত পানি পান করে মুখ ভেজা রাখুন, কারণ শুষ্ক মুখ ঘা বাড়িয়ে দিতে পারে।
  • মানসিক চাপ কমানো: পর্যাপ্ত ঘুম, হালকা ব্যায়াম ও মেডিটেশন স্ট্রেস কমিয়ে ঘা প্রতিরোধে সাহায্য করে।
  • পুষ্টিকর খাবার: ভিটামিন বি১২, আয়রন, ফোলেট ও জিঙ্ক সমৃদ্ধ খাবার (যেমন শাকসবজি, ডিম, মাছ, ডাল) খাদ্যতালিকায় রাখুন।

মনে রাখবেন, ঘরোয়া প্রতিকার শুধুমাত্র উপসর্গ কমায়। যদি ঘা দীর্ঘস্থায়ী হয় বা বারবার ফিরে আসে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

মুখের ঘা কি ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে?

সাধারণত মুখের ভেতরের ঘা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ক্ষতিকর এবং কিছুদিনেই সেরে যায়। তবে খুব কম ক্ষেত্রেই এটি মুখের ক্যানসারের শুরুর লক্ষণ হতে পারে। যে ঘা ২-৩ সপ্তাহের বেশি ধরে না সারে, ব্যথা না থাকলেও বড় হয়ে যায়, কিংবা বারবার একই জায়গায় হয়, সেটি সম্পর্কে সতর্ক থাকা দরকার। এমন ঘা ক্যানসার কি না তা শুধু দেখে বোঝা যায় না, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা (বায়োপসি) জরুরি। মুখের ক্যানসার তুলনামূলক বিরল, তবে ধূমপান, তামাক, মদ্যপান বা অতিরিক্ত পান-সুপারির অভ্যাস থাকলে ঝুঁকি বাড়ে।

মুখের ঘা কি ছোঁয়াচে?

মুখের ঘা কতটা ছোঁয়াচে, তা নির্ভর করে ঘা-র কারণের উপর। যাকে আমরা সাধারণত ‘ক্যানকার সোর’ বা আফথাস আলসার বলি, সেটি ছোঁয়াচে নয়। কিন্তু ঠান্ডা ঘা (কোল্ড সোর) বা হারপিস সংক্রমণের কারণে যে ঘা হয়, সেটি স্পর্শ বা লালার মাধ্যমে ছড়াতে পারে, বিশেষ করে ঘা ফোস্কা অবস্থায় থাকলে। কাজেই কারো মুখে ঘা দেখা গেলে হাত ধোয়া, নিজের জিনিস আলাদা রাখা—এসব সতর্কতা মেনে চললে সংক্রমণ এড়ানো যায়।

কোন ধরনের খাবার বা অভ্যাস মুখের ঘা বাড়িয়ে দিতে পারে?

গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, মশলাদার, ঝাল, টক বা অতিরিক্ত গরম খাবার মুখের ঘা-কে জ্বালাতে পারে এবং সারে দেরি করায়। আনারস, কমলা, টমেটোর মতো এসিডিক খাবার, খাস্তা বা শক্ত খাবার (চিপস, টোস্ট) যা মুখের ভেতরে আঁচড় লাগায়, সেগুলোও সমস্যা বাড়ায়। এছাড়া আঁটসাঁট দাঁত, ভাঙা দাঁতের ধার বা বাজে ফিলিং-এর কারণে বারবার ঘা হতে পারে।

ভিটামিনের অভাবে কি মুখে ঘা হয়?

হ্যাঁ, কিছু ভিটামিন বা খনিজের অভাব মুখের ঘা-র সাথে যুক্ত হতে পারে, বিশেষ করে ভিটামিন বি১২, ফলিক অ্যাসিড, আয়রন বা জিংকের ঘাটতি। যাদের ঘন ঘন মুখে ঘা হয়, তাদের রক্ত পরীক্ষা করে এই ঘাটতি আছে কি না দেখা অনেক সময় সহায়ক। তবে মানে এই নয় যে প্রতিটি মুখের ঘা ভিটামিনের অভাব থেকে হয়—চাপ, ঘুম কম হওয়া, হরমোনের পরিবর্তনও ভূমিকা রাখে। নিজে থেকে উচ্চমাত্রার ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

মুখের ঘা সাধারণত কত দিনে সেরে যায় এবং কখন ডাক্তার দেখানো জরুরি?

সাধারণ মুখের ঘা সাধারণত ৭-১৪ দিনের মধ্যে নিজে নিজে সেরে যায়। তবে যদি ঘা ৩ সপ্তাহের বেশি থাকে, আকারে বড় হয়, একাধিক জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে, সাথে জ্বর বা গলায় ফোলা থাকে, অথবা খাওয়া-গিলতে অসম্ভব কষ্ট হয়, তাহলে দেরি না করে ডাক্তার দেখানো উচিত। যাঁরা দুর্বল ইমিউন সিস্টেম নিয়ে থাকেন, ডায়াবেটিস রোগী বা যাঁরা দীর্ঘদিন ওষুধ খান, তাঁদের ক্ষেত্রে একটু আগেই সতর্ক হওয়া ভালো।

তথ্যসূত্র

উপরের তথ্যসূত্রগুলো আন্তর্জাতিক জার্নাল, সরকারি স্বাস্থ্য সংস্থা বা স্বীকৃত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া:

Rate this post