Skip to content

দাঁত থেকে রক্ত পড়ার কারণ?

দাঁত থেকে রক্ত পড়ার কারণ?
Rate this post

ব্রাশ করার সময় বা কোনো কিছু কামড় দেওয়ার পর যদি মাড়ি থেকে রক্ত বের হয়, তাহলে অনেকেই চিন্তায় পড়ে যান। তবে আতঙ্কিত হওয়ার আগে একটি বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া জরুরি: দাঁত নিজে থেকে কখনো রক্ত ঝরায় না। রক্ত আসলে আসে মাড়ি বা দাঁতের আশপাশের নরম টিস্যু থেকে। এটি একটি খুব সাধারণ সমস্যা, এবং বেশিরভাগ সময় মাড়ির প্রদাহ (gingivitis) বা সামান্য আঘাতের কারণে হয়। সঠিক পরিচর্যা ও সময়মতো চিকিৎসা নিলে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তবে দীর্ঘদিন ধরে রক্ত পড়তে থাকলে তা অবহেলা না করে ডেন্টিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

দাঁত থেকে রক্ত পড়ার মানে কী?

অনেকেই মনে করেন দাঁতের গোড়া থেকে রক্ত ঝরছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে রক্ত আসে মাড়ি বা পিরিওডন্টাল টিস্যু থেকে। দাঁতের গায়ে জমা প্লাক ও ক্যালকুলাস (পাইপস) মাড়িকে স্ফীত ও সংবেদনশীল করে তোলে। এই স্ফীত মাড়ি সামান্য চাপেই রক্ত ঝরাতে শুরু করে। তাই ‘দাঁত থেকে রক্ত পড়া’ কথাটা আসলে ভুল ধারণা; বরং একে ‘মাড়ি থেকে রক্ত পড়া’ বলাই বেশি সঠিক।

মাড়ি থেকে রক্ত পড়ার সাধারণ কারণগুলো কী কী?

মাড়ি থেকে রক্ত পড়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। নিচের ছকটি দেখলে কারণগুলোর তুলনা বুঝতে সুবিধা হবে:

মাড়ি থেকে রক্ত পড়ার সাধারণ কারণ: কোনটা কতটা জরুরি
কারণ যেভাবে প্রকাশ পায় কতটা সাধারণ প্রাথমিক করণীয়
প্লাক জমা / জিঞ্জিভাইটিস ব্রাশে হালকা রক্ত, মাড়ি ফোলা খুবই সাধারণ নরম ব্রাশ, সঠিক পরিচর্যা
পাইপস (ক্যালকুলাস) মাড়ি ফোলা, দুর্গন্ধ, রক্তপাত সাধারণ ডেন্টিস্টের স্কেলিং
পিরিয়ডোনটাইটিস মাড়ি সরে যাওয়া, দাঁত নড়া কমন কিন্তু গুরুতর ডেন্টাল চিকিৎসা প্রয়োজন
ভুল ব্রাশিং/মিসওয়াক কেটে রক্ত পড়া সাধারণ কৌশল পরিবর্তন
ভিটামিন সি/কে অভাব দুর্বল মাড়ি, রক্তপাত অপেক্ষাকৃত কম পুষ্টিকর খাবার, ডাক্তার
ডায়াবেটিস রক্ত পড়া, শুকনো মুখ মাঝারি ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণ
রক্ত পাতলা করার ওষুধ অতিরিক্ত রক্তপাত ওষুধ চলাকালে ডাক্তারকে জানান, ওষুধ বন্ধ নয়
হরমোন পরিবর্তন (গর্ভাবস্থা) মাড়ি ফোলা, রক্তপাত সাধারণ ডেন্টাল চেকআপ

ব্রাশ, ফ্লসিং বা মিসওয়াকে বেশি চাপ দিলেও কি রক্ত পড়ে?

অবশ্যই। বাংলাদেশে অনেকেই শক্ত ব্রাশ বা মিসওয়াক ব্যবহার করেন এবং জোরে জোরে ঘষার অভ্যাস থাকে। এতে মাড়ি কেটে গিয়ে রক্ত পড়া খুব সাধারণ ব্যাপার। মিসওয়াক ব্যবহার করলেও মাড়িতে বেশি চাপ না দিয়ে নরমভাবে ব্যবহার করা উচিত। ব্রাশ করার সময় বৃত্তাকারে (circular motion) হালকা চাপ দিয়ে ব্রাশ করলে মাড়ি কাটার সম্ভাবনা কমে। ফ্লসিং করলেও প্রথম প্রথম রক্ত আসতে পারে, কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যে মাড়ি অভ্যস্ত হয়ে গেলে রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে যায়।

ভিটামিনের অভাব, হরমোন বা ওষুধ—কখন এগুলো ভাবা উচিত?

শুধু দাঁতের পরিচর্যার অভাবে নয়, শরীরের ভিতরকার কিছু কারণেও মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়তে পারে। ভিটামিন সি ও কে-এর অভাবে মাড়ির টিস্যু দুর্বল হয়ে পড়ে। ডায়াবেটিস থাকলে রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণ না থাকলে মাড়ির সংক্রমণ ও রক্তপাত বাড়ে। গর্ভাবস্থা বা মেনোপজের সময় হরমোনের পরিবর্তনের কারণেও মাড়ি ফুলে রক্ত পড়তে পারে। আর যারা রক্ত পাতলা করার ওষুধ (যেমন অ্যাসপিরিন, ওয়ারফারিন) খান, তাদের মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া স্বাভাবিক। মনে রাখবেন, নিজে থেকে কখনো ওষুধ বন্ধ করবেন না; বরং ডেন্টিস্ট ও মেডিকেল ডাক্তার উভয়কে বিষয়টি জানিয়ে পরামর্শ নিন।

কখন দাঁতের ডাক্তার আর কখন সাধারণ চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

সব সময় ডেন্টিস্টের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নাও হতে পারে। নিচের ছকটি দেখে সিদ্ধান্ত নিন:

কোন লক্ষণে দ্রুত চিকিৎসক দেখাবেন
লক্ষণ যা ইঙ্গিত হতে পারে কোথায় যাবেন
ব্রাশে হালকা রক্ত, মাড়ি ফোলা জিঞ্জিভাইটিস/পাইপস ডেন্টিস্ট
অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, জ্বর, দুর্বলতা রক্তস্বল্পতা বা সংক্রমণ মেডিকেল ডাক্তার
শরীরের অন্য জায়গায় কেটে গেলে রক্ত বন্ধ না হওয়া রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা মেডিকেল ডাক্তার
গর্ভাবস্থায় মাড়ি ফুলে রক্ত পড়া হরমোনজনিত মাড়ির প্রদাহ ডেন্টিস্ট + গাইনি
ডায়াবেটিস থাকলে বারবার রক্ত পড়া ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নেই মেডিকেল ডাক্তার + ডেন্টিস্ট

ঘরোয়া যত্ন এবং ডেন্টাল চিকিৎসায় কী করানো হয়?

ঘরোয়া যত্নের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নরম ব্রাশ ব্যবহার করা এবং দিনে দুইবার সঠিক নিয়মে দাঁত ব্রাশ করা। লবণ পানি দিয়ে কুলি করলে সাময়িক আরাম পাওয়া যায়, তবে এটি কোনো স্থায়ী চিকিৎসা নয়। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য মাড়ির জন্য খুব ক্ষতিকর, এগুলো এড়িয়ে চলা উচিত।

ডেন্টাল চিকিৎসায় সাধারণত স্কেলিং (পাইপস পরিষ্কার) ও রুট প্লেনিং করা হয়। এতে মাড়ির প্রদাহ কমে এবং রক্ত পড়া বন্ধ হয়। প্রয়োজনে গাম ট্রিটমেন্ট বা অ্যান্টিবায়োটিক থেরাপি দেওয়া হতে পারে।

বিভাগ অনুযায়ী ডেন্টিস্ট ও ডেন্টাল ক্লিনিক

আপনার নিকটস্থ অভিজ্ঞ ডেন্টিস্ট বা ডেন্টাল ক্লিনিক খুঁজতে নিচের তালিকা দেখুন:

বিভাগ ডেন্টাল তালিকা
Dhaka ঢাকায় ডেন্টাল ক্লিনিক
Chattogram চট্টগ্রামে ডেন্টাল ক্লিনিক
Khulna খুলনায় ডেন্টাল ক্লিনিক
Rajshahi রাজশাহীতে ডেন্টাল ক্লিনিক
Rangpur রংপুরে ডেন্টাল ক্লিনিক
Sylhet সিলেটে ডেন্টাল ক্লিনিক
Barishal বরিশালে ডেন্টাল ক্লিনিক
Mymensingh ময়মনসিংহে ডেন্টাল ক্লিনিক

সবশেষে যা মনে রাখবেন

মাড়ি থেকে রক্ত পড়া একটি সাধারণ সমস্যা, কিন্তু এটিকে ‘সাধারণ’ ভেবে অবহেলা করা ঠিক নয়। দীর্ঘদিন রক্ত পড়লে এটি পিরিয়ডোনটাইটিসের মতো জটিল রোগের লক্ষণ হতে পারে, যা দাঁত পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। ঘরোয়া টোটকার চেয়ে একজন অভিজ্ঞ ডেন্টিস্টের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ এবং কার্যকর। নিয়মিত ডেন্টাল চেকআপ ও সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে মাড়ির রক্তপাত পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

মাড়ি থেকে রক্ত পড়া কি ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে?

মাড়ি থেকে রক্ত পড়া সাধারণত ক্যানসারের লক্ষণ নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি মাড়ির প্রদাহ (gingivitis) বা পিরিয়ডোনটাইটিসের কারণে হয়। তবে খুব বিরল ক্ষেত্রে মুখের ক্যানসার বা রক্তের রোগ (যেমন লিউকেমিয়া) মাড়ি ফুলে রক্ত পড়ার কারণ হতে পারে। যদি রক্ত পড়ার পাশাপাশি মুখের কোনো ঘা দীর্ঘদিন না সারে, দাঁত নড়ে, বা অস্বাভাবিক ফোলা থাকে, তাহলে দ্রুত ডেন্টিস্টের পাশাপাশি একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই নিরাপদ।

গর্ভাবস্থায় মাড়ি থেকে রক্ত পড়া কি স্বাভাবিক? কী করবেন?

গর্ভাবস্থায় হরমোনের পরিবর্তনের কারণে মাড়ি বেশি সংবেদনশীল হয়ে পড়ে এবং সহজেই রক্ত ঝরাতে পারে। এটি ‘প্রেগন্যান্সি জিঞ্জিভাইটিস’ নামে পরিচিত এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক। তবে এটিকে অবহেলা করা উচিত নয়। গর্ভাবস্থায় নরম ব্রাশ ব্যবহার করে দিনে দুইবার ব্রাশ করুন, ফ্লসিং চালিয়ে যান এবং নিয়মিত ডেন্টিস্টের কাছে চেকআপ করান। কোনো ওষুধ বা মাউথওয়াশ নিজে থেকে ব্যবহার করবেন না—সবকিছু ডাক্তারের পরামর্শে করুন।

দাঁত থেকে রক্ত পড়া বন্ধ করতে ঘরোয়া উপায়ে লবণ পানি দিয়ে কুলকুচি করা কি নিরাপদ?

হ্যাঁ, হালকা গরম পানিতে লবণ মিশিয়ে কুলকুচি করা একটি নিরাপদ ও কার্যকর ঘরোয়া উপায়। এটি মাড়ির প্রদাহ কমাতে এবং ক্ষতস্থান পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। তবে মনে রাখবেন, এটি শুধু সাময়িক উপশম দেয়—মূল কারণ যেমন প্লাক জমা বা ইনফেকশন দূর করে না। দিনে ২-৩ বারের বেশি লবণ পানি ব্যবহার করবেন না এবং দীর্ঘমেয়াদে ডেন্টিস্টের পরামর্শ ছাড়া এটি নির্ভর করবেন না। যদি রক্ত পড়া বন্ধ না হয়, তাহলে চিকিৎসকের কাছে যান।

ব্রাশ করার সময় রক্ত পড়লে কি ব্রাশ করা বন্ধ রাখা উচিত?

একেবারেই না। বরং ব্রাশ বন্ধ রাখলে প্লাক ও ব্যাকটেরিয়া জমে মাড়ির অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে। রক্ত পড়ার মানেই মাড়ি দুর্বল বা স্ফীত—এটি পরিষ্কার করার প্রয়োজন। নরম ব্রাশ ব্যবহার করে আলতোভাবে ব্রাশ চালিয়ে যান। প্রথম কয়েকদিন রক্ত আসতে পারে, কিন্তু নিয়মিত পরিষ্কার করলে ৩-৭ দিনের মধ্যে রক্ত পড়া কমে যাওয়ার কথা। যদি এক সপ্তাহ পরও রক্ত পড়া না কমে, তাহলে ডেন্টিস্টের কাছে যান।

দাঁতের ডাক্তার ছাড়া কি সাধারণ চিকিৎসক মাড়ি থেকে রক্ত পড়ার সমস্যা সমাধান করতে পারেন?

সাধারণ চিকিৎসক (মেডিসিন বিশেষজ্ঞ) প্রাথমিকভাবে রক্ত পরীক্ষা করে ভিটামিনের অভাব, ডায়াবেটিস বা রক্তের রোগ শনাক্ত করতে পারেন। তবে মাড়ি থেকে রক্ত পড়ার প্রধান কারণ দাঁতের প্লাক ও মাড়ির রোগ, যা শুধু ডেন্টিস্টই সঠিকভাবে নির্ণয় ও চিকিৎসা করতে পারেন। তাই প্রথমে ডেন্টিস্টের কাছে যাওয়াই উত্তম। ডেন্টিস্ট যদি সন্দেহ করেন যে অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা আছে, তাহলে তিনি আপনাকে মেডিসিন বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠাবেন।

তথ্যসূত্র

উপরের তথ্যসূত্রগুলো আন্তর্জাতিক জার্নাল, সরকারি স্বাস্থ্য সংস্থা বা স্বীকৃত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া:

Rate this post