Skip to content

দাঁত ঘষার অভ্যাস দূর করার উপায়?

দাঁত ঘষার অভ্যাস দূর করার উপায়?
Rate this post

দাঁত ঘষার অভ্যাস, যাকে চিকিৎসা পরিভাষায় ব্রুক্সিজম বলা হয়, অনেক মানুষের মধ্যে দেখা যায়। এটি সাধারণত ঘুমের সময় বা দিনের বেলায় অজান্তেই হয়ে থাকে। এই অভ্যাসের কারণে দাঁতের এনামেল ক্ষয় হয়ে যেতে পারে, দাঁত সংবেদনশীল হয়ে পড়তে পারে এবং চোয়ালের জয়েন্টে ব্যথা, মাথাব্যথা বা কানের ব্যথার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে সঠিক কারণ চিহ্নিত করে কিছু পদক্ষেপ নিলে এই অভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এই নিবন্ধে আমরা দাঁত ঘষার কারণ, লক্ষণ ও কার্যকরী প্রতিকার নিয়ে আলোচনা করব।

দাঁত ঘষার অভ্যাস কেন হয়?

দাঁত ঘষার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • মানসিক চাপ ও উদ্বেগ: দৈনন্দিন জীবনের স্ট্রেস, কাজের চাপ বা উদ্বেগ দাঁত ঘষার অভ্যাসকে বাড়িয়ে দিতে পারে।
  • ঘুমের ব্যাধি: স্লিপ অ্যাপনিয়া বা নাক ডাকার মতো ঘুমের সমস্যা থাকলে দাঁত ঘষার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
  • দাঁতের অসামঞ্জস্যতা: দাঁতের বিন্যাস ঠিক না থাকলে বা কামড়ানোর সময় দাঁতের মধ্যে অসামঞ্জস্যতা থাকলে এই অভ্যাস দেখা দিতে পারে।
  • কিছু ওষুধ: কিছু এন্টিডিপ্রেসেন্ট বা সাইকিয়াট্রিক ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবেও দাঁত ঘষা হতে পারে।
  • জীবনযাত্রার অভ্যাস: অতিরিক্ত ক্যাফেইন বা অ্যালকোহল গ্রহণ, ধূমপান ইত্যাদিও দাঁত ঘষার ঝুঁকি বাড়ায়।

কারণ বোঝা গেলে চিকিৎসা সহজ হয়। তাই প্রথমে একজন ডেন্টিস্টের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

দাঁত ঘষার লক্ষণ ও সম্ভাব্য জটিলতা

দাঁত ঘষার অভ্যাস থাকলে নিম্নলিখিত লক্ষণগুলি দেখা যেতে পারে:

  • দাঁতের এনামেল ক্ষয় হয়ে দাঁত চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া বা ছোট হয়ে যাওয়া।
  • দাঁতে সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি পাওয়া, বিশেষ করে গরম বা ঠান্ডা খাবারে।
  • চোয়ালের পেশিতে ব্যথা বা টান ধরানো, বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর।
  • মাথাব্যথা, কানের ব্যথা বা মুখমণ্ডলের ব্যথা।
  • দাঁতের ফাটল বা ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া।

দীর্ঘমেয়াদে এই অভ্যাস টেম্পোরোম্যান্ডিবুলার জয়েন্ট (TMJ) ডিজঅর্ডার সৃষ্টি করতে পারে, যা চোয়ালের নড়াচড়ায় সমস্যা তৈরি করে। তাই প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলেই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

ঘরোয়া উপায়ে দাঁত ঘষা কমানোর পদ্ধতি

সব ক্ষেত্রে পেশাদার চিকিৎসার প্রয়োজন নাও হতে পারে। কিছু ঘরোয়া পদ্ধতি এই অভ্যাস কমাতে সাহায্য করতে পারে:

  • স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট: মেডিটেশন, গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, যোগব্যায়াম বা পর্যাপ্ত বিশ্রাম মানসিক চাপ কমাতে পারে।
  • চোয়ালের ব্যায়াম: চোয়ালের পেশি শিথিল করার জন্য কিছু হালকা ব্যায়াম করা যেতে পারে। যেমন, মুখ খুলে বন্ধ করা, জিহ্বা তালুতে রেখে চোয়াল শিথিল রাখা।
  • ঘুমের আগে ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা: এসব উপাদান দাঁত ঘষার প্রবণতা বাড়িয়ে দিতে পারে।
  • ঘুমের পরিবেশ শান্ত রাখা: আরামদায়ক বিছানা, মৃদু আলো ও শব্দহীন পরিবেশ ঘুমের মান উন্নত করে।
  • মাউথগার্ড ব্যবহার: ফার্মেসি থেকে কেনা ওভার-দ্য-কাউন্টার মাউথগার্ড কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে, তবে কাস্টম-ফিটেড মাউথগার্ড বেশি কার্যকর।

তবে মনে রাখবেন, তীব্র বা দীর্ঘস্থায়ী অভ্যাসের ক্ষেত্রে ঘরোয়া পদ্ধতি যথেষ্ট নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

চিকিৎসকের পরামর্শ ও পেশাদার চিকিৎসা

যদি ঘরোয়া পদ্ধতিতে কাজ না হয় বা দাঁতের ক্ষতি গুরুতর হয়, তাহলে দাঁতের ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। ডেন্টিস্ট আপনার দাঁতের অবস্থা মূল্যায়ন করে উপযুক্ত চিকিৎসার পরামর্শ দেবেন। নিচে বিভিন্ন পেশাদার চিকিৎসা পদ্ধতির তুলনা দেওয়া হলো:

পদ্ধতি বিবরণ কার্যকারিতা খরচ (আনুমানিক) সুবিধা অসুবিধা
কাস্টম-ফিটেড মাউথগার্ড ডেন্টিস্টের নেওয়া ছাঁচ অনুযায়ী তৈরি নাইট গার্ড অত্যন্ত কার্যকর, দাঁতকে সম্পূর্ণ সুরক্ষা দেয় মাঝারি থেকে উচ্চ আরামদায়ক, দীর্ঘস্থায়ী, দাঁতের ক্ষতি রোধ করে খরচ বেশি, ডেন্টিস্টের কাছে যেতে হয়
ওভার-দ্য-কাউন্টার মাউথগার্ড ফার্মেসি থেকে কেনা সাধারণ মাউথগার্ড মাঝারি, কিছুটা সুরক্ষা দেয় কম সুলভ, সহজলভ্য আরাম কম, দীর্ঘস্থায়ী নয়, দাঁতের সাথে মানানসই নাও হতে পারে
স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট থেরাপি কাউন্সেলিং, রিলাক্সেশন টেকনিক মাঝারি থেকে উচ্চ (কারণভেদে) পরিবর্তনশীল সামগ্রিক মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি সময়সাপেক্ষ, সবার জন্য কার্যকর নাও হতে পারে
বিহেভিয়ারাল থেরাপি অভ্যাস পরিবর্তনের জন্য কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি কার্যকর হতে পারে পরিবর্তনশীল দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল দিতে পারে পেশাদার থেরাপিস্টের প্রয়োজন
বোটক্স ইনজেকশন চোয়ালের পেশিতে বোটক্স দিয়ে পেশির সংকোচন কমানো গবেষণায় কার্যকর প্রমাণিত উচ্চ দ্রুত ফলাফল, অস্ত্রোপচার ছাড়াই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে করতে হবে, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে, খরচ বেশি

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

  • যদি দাঁতের ক্ষতি বা ব্যথা গুরুতর হয়।
  • যদি ঘরোয়া পদ্ধতিতে কোনো উন্নতি না হয়।
  • যদি ঘুমের মধ্যে নাক ডাকা বা স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো সমস্যা থাকে।
  • যদি শিশুদের ক্ষেত্রে বয়স বাড়লেও অভ্যাস না কমে।

ডেন্টিস্টের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ বা ইনজেকশন নেবেন না।

দাঁত ঘষার অভ্যাস প্রতিরোধে করণীয়

দীর্ঘমেয়াদে এই অভ্যাস প্রতিরোধ করতে কিছু অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি:

  • নিয়মিত ডেন্টাল চেক-আপ করান। বছরে অন্তত একবার দাঁতের ডাক্তার দেখানো ভালো।
  • মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত ব্যায়াম, মেডিটেশন বা শখের কাজ করুন।
  • ঘুমের রুটিন ঠিক রাখুন: প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো ও ওঠা, ঘুমের আগে ইলেকট্রনিক ডিভাইস এড়িয়ে চলা।
  • শিশুদের ক্ষেত্রে: দাঁত ঘষার অভ্যাস সাধারণত ৬-৭ বছর বয়সের পর কমে যায়। তবে যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে শিশু ডেন্টিস্টের পরামর্শ নিন।
  • দাঁতের ক্লিনজিং ও ফ্লসিং নিয়মিত করুন, দাঁত সুস্থ রাখলে ঘষার প্রবণতা কমতে পারে।

বিভাগ অনুযায়ী ডেন্টিস্ট ও ডেন্টাল ক্লিনিক

দাঁত ঘষার অভ্যাস দূর করতে বা সঠিক চিকিৎসা পেতে আপনার নিকটস্থ ডেন্টিস্ট খুঁজুন:

বিভাগ ডেন্টাল তালিকা
Dhaka ঢাকায় যাচাইকৃত ডেন্টিস্ট
Chattogram চট্টগ্রামে জনপ্রিয় ডেন্টিস্ট
Khulna খুলনায় যাচাইকৃত ডেন্টিস্ট
Rajshahi রাজশাহীতে জনপ্রিয় ডেন্টিস্ট
Rangpur রংপুরে যাচাইকৃত ডেন্টিস্ট
Sylhet সিলেটে ডেন্টিস্ট খুঁজুন
Barishal বরিশালে ডেন্টিস্ট
Mymensingh ময়মনসিংহে দাঁতের ডাক্তার

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

দাঁত ঘষার অভ্যাস কি নিজে নিজে চলে যেতে পারে?

হ্যাঁ, অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই অভ্যাস নিজে নিজে কমে যেতে পারে। তবে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এটি সাধারণত নিজে থেকে পুরোপুরি সেরে যায় না। যদি দাঁতে ব্যথা, চোয়ালে চাপ বা মাথাব্যথার মতো লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। অন্যথায় দাঁতের এনামেল ক্ষয় বা জয়েন্টের সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

দাঁত ঘষার অভ্যাসের জন্য কি সব সময় স্ট্রেস দায়ী?

স্ট্রেস একটি প্রধান কারণ হলেও এটি একমাত্র কারণ নয়। ঘুমের সমস্যা যেমন স্লিপ অ্যাপনিয়া, দাঁতের ভুল বিন্যাস (ম্যালোক্লুশন), কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, অথবা উদ্বেগজনিত ব্যাধিও দাঁত ঘষার কারণ হতে পারে। তাই শুধু স্ট্রেস কমানোর পাশাপাশি অন্যান্য সম্ভাব্য কারণগুলো চিহ্নিত করাও জরুরি। একজন ডেন্টিস্ট বা স্লিপ স্পেশালিস্ট সঠিক কারণ নির্ণয়ে সাহায্য করতে পারেন।

মাউথগার্ড ব্যবহার করলে কি দাঁত ঘষার অভ্যাস পুরোপুরি বন্ধ হয়?

মাউথগার্ড দাঁত ঘষার অভ্যাস বন্ধ করে না, বরং এটি দাঁতের উপর সরাসরি চাপ পড়া থেকে রক্ষা করে। এটি একটি প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা যা দাঁতের এনামেল ক্ষয় ও চোয়ালের জয়েন্টের ওপর চাপ কমায়। তবে অভ্যাসটি থেকে মুক্তি পেতে স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট, চোয়ালের ব্যায়াম বা অন্যান্য থেরাপির প্রয়োজন হতে পারে। মাউথগার্ড শুধু উপসর্গ ব্যবস্থাপনার একটি অংশ, স্থায়ী সমাধান নয়।

ঘুমানোর আগে গরম পানির সেঁক বা চা খেলে কি দাঁত ঘষা কমে?

ঘুমানোর আগে চোয়ালের পেশিতে গরম সেঁক দেওয়া বা ক্যাফেইনমুক্ত ভেষজ চা (যেমন ক্যামোমাইল) খাওয়া পেশি শিথিল করতে সাহায্য করতে পারে, যা দাঁত ঘষার তীব্রতা কমাতে সহায়ক। তবে এটি সরাসরি অভ্যাস দূর করে না। এটি একটি সহায়ক ঘরোয়া পদ্ধতি, কিন্তু নিয়মিত দাঁত ঘষার সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ ও পেশাদার চিকিৎসার বিকল্প নয়।

দাঁত ঘষার অভ্যাস কি দাঁতের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে?

হ্যাঁ, দীর্ঘমেয়াদী দাঁত ঘষার অভ্যাস দাঁতের এনামেল ক্ষয় করে দাঁতকে সংবেদনশীল করে তুলতে পারে, দাঁত ফেটে যেতে পারে বা ভেঙে যেতে পারে এবং চোয়ালের জয়েন্টে (টিএমজে) স্থায়ী সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে দাঁতের গঠন পরিবর্তন বা দাঁত পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে লক্ষণ চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

তথ্যসূত্র

উপরের তথ্যসূত্রগুলো আন্তর্জাতিক জার্নাল, সরকারি স্বাস্থ্য সংস্থা বা স্বীকৃত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া:

Rate this post