Skip to content

মুখে শুষ্কতার কারণ কি?

মুখে শুষ্কতার কারণ কি?
Rate this post

মুখ শুকিয়ে যাওয়া বা লালা কমে যাওয়া—এমন অভিজ্ঞতা প্রায় সবারই কম-বেশি হয়। কখনও খাওয়ার পর, কখনও বেশি কথা বলার সময়, আবার কখনও রাতে ঘুম থেকে উঠে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি খুবই পরিচিত একটি সমস্যা। কিন্তু অনেকে জানেন না যে মুখের শুষ্কতা আসলে কোনো রোগ নয়; এটি বিভিন্ন শারীরিক অবস্থা, অভ্যাস বা অন্তর্নিহিত রোগের লক্ষণ হতে পারে। এই নিবন্ধে আমরা সহজ ভাষায় বোঝার চেষ্টা করব মুখ শুষ্কতার পেছনে কী কী কারণ থাকতে পারে এবং কখন সেটি নিয়ে চিন্তিত হওয়া উচিত।

মুখ শুষ্কতা আসলে কী?

মুখ শুষ্কতা বা Xerostomia বলতে বোঝায় লালা গ্রন্থি থেকে পর্যাপ্ত লালা না উৎপন্ন হওয়া। লালা শুধু মুখ ভেজা রাখে না, এটি খাবার হজমে সাহায্য করে, দাঁত ও মাড়িকে জীবাণু থেকে রক্ষা করে এবং গিলতে সুবিধা করে। যখন লালার পরিমাণ কমে যায়, তখন মুখ ভেজা থাকে না, জিহ্বা আঠালো লাগে, পিপাসা বাড়ে এবং খাবারের স্বাদ কমে যেতে পারে। বাংলাদেশের মতো উষ্ণ আবহাওয়ায় শরীরের পানি দ্রুত শুকিয়ে যায়, তাই পানিশূন্যতা একটি খুব সাধারণ কারণ। তবে এটি ছাড়াও আরও অনেক কারণ রয়েছে যা একটু বিস্তারিত জেনে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

প্রচলিত কারণ: ডিহাইড্রেশন, জীবনযাত্রা ও অভ্যাস

  • পানিশূন্যতা (ডিহাইড্রেশন): বাংলাদেশের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় শরীর থেকে ঘামের মাধ্যমে প্রচুর পানি বেরিয়ে যায়। পর্যাপ্ত পানি না পান করলে সবচেয়ে দ্রুত মুখ শুকিয়ে যায়। দিনে অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি পান করা জরুরি।
  • ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য: ধূমপান, জর্দা বা সাদাপাতা মুখের লালা উৎপাদন কমিয়ে দেয়। বাংলাদেশে ধূমপান ও তামাকের ব্যবহার এখনও অনেকের অভ্যাস, যা দীর্ঘমেয়াদে মুখ শুষ্কতা বাড়ায়।
  • পান-সুপারি চিবানো: পান-সুপারি চিবালে প্রথমে মুখে লালা বেশি হলেও, দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে লালা গ্রন্থি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং মুখ শুষ্ক হয়ে যায়।
  • অতিরিক্ত চা-কফি ও অ্যালকোহল: চা-কফিতে থাকা ক্যাফেইন এবং অ্যালকোহল—উভয়ই শরীর থেকে পানি বের করে দেয় (ডাইউরেটিক প্রভাব), যার ফলে মুখ শুকিয়ে যেতে পারে।
  • মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া: যদি নাক বন্ধ থাকে অথবা অভ্যাসবশত মুখ দিয়ে শ্বাস নেন, তাহলে ঘুমানোর সময় মুখ শুকিয়ে যায়। এটি বাংলাদেশের অনেকের ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বিশেষ করে অ্যালার্জি বা সর্দি-কাশির সময়।

কোন কোন ওষুধের কারণে মুখ শুকিয়ে যেতে পারে?

বিভিন্ন ধরনের ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে মুখ শুষ্কতা খুবই সাধারণ। নিচের ওষুধগুলো এই সমস্যার জন্য বেশি দায়ী:

  • অ্যান্টিহিস্টামিন (যেমন অ্যালার্জির ওষুধ)
  • ডায়ুরেটিক (প্রস্রাব বাড়ানোর ওষুধ, যা উচ্চ রক্তচাপে দেওয়া হয়)
  • এন্টিডিপ্রেসেন্ট ও এন্টি-অ্যাংজাইটি ওষুধ
  • হাইপারটেনশনের কিছু ওষুধ
  • পেশি শিথিলকারী ওষুধ
  • কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি (মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসারের চিকিৎসায়)

বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে একসঙ্গে একাধিক ওষুধ সেবনের কারণে মুখ শুষ্কতা বেশি দেখা যায়। তবে মনে রাখবেন: কোনো ওষুধ নিজে থেকে বন্ধ বা ডোজ কমাবেন না। সন্দেহ হলে আপনার চিকিৎসক বা ডেন্টিস্টের সঙ্গে কথা বলুন।

কোন কোন রোগের লক্ষণ হতে পারে মুখ শুষ্কতা?

কখনও কখনও মুখ শুষ্কতা কোনো অন্তর্নিহিত রোগের প্রথম ইঙ্গিত হতে পারে। বাংলাদেশে যেসব রোগের সঙ্গে এটি জড়িত:

  • ডায়াবেটিস: রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি হলে প্রস্রাব বেশি হয় এবং শরীর থেকে পানি বেরিয়ে যায়, ফলে মুখ শুকিয়ে যায়। ডায়াবেটিসের অন্যতম সাধারণ একটি লক্ষণ এটি।
  • সজোগ্রেন সিনড্রোম (Sjögren’s syndrome): এটি একটি অটোইমিউন রোগ যেখানে শরীরের নিজের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা লালা ও অশ্রু গ্রন্থিতে আক্রমণ করে। এর ফলে মুখ ও চোখ দুটোই শুকিয়ে যায়। মেনোপজ পরবর্তী নারীদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়।
  • থাইরয়েড সমস্যা: হাইপোথাইরয়েডিজম বা থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতির সাথেও মুখ শুষ্কতা যুক্ত হতে পারে।
  • ভিটামিনের অভাব: ভিটামিন এ, বি কমপ্লেক্স বা আয়রনের অভাবে মুখের মিউকাস মেমব্রেন শুষ্ক হয়ে যেতে পারে।
  • স্নায়বিক সমস্যা: স্ট্রোক, পারকিনসন বা আলঝেইমারের মতো রোগ মুখের স্নায়ু নিয়ন্ত্রণকে প্রভাবিত করে, যার ফলে লালা উৎপাদন কমে যায়।

এই রোগগুলো নিজে থেকে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। তাই দীর্ঘস্থায়ী মুখ শুষ্কতা থাকলে রক্ত পরীক্ষা সহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করিয়ে অন্তর্নিহিত কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি?

অনেক সময় মুখ শুষ্কতা অস্থায়ী এবং সহজেই ঠিক হয়ে যায়। তবে নিচের যেকোনো একটি উপসর্গ থাকলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন:

  • মুখের শুষ্কতা দীর্ঘদিন ধরে চলছে এবং নিজে থেকে কমছে না
  • গিলতে বা খাবার চিবাতে অসুবিধা হচ্ছে
  • জ্বর বা গলাব্যথা রয়েছে
  • অনিচ্ছাকৃত ওজন কমে যাচ্ছে
  • দাঁতে অতিরিক্ত ক্ষয় বা ক্যাভিটি তৈরি হচ্ছে
  • জিহ্বায় জ্বালাপোড়া বা ফাটল দেখা দিয়েছে
  • মুখের ভেতরে ঘা ঘন ঘন হচ্ছে

মুখের শুষ্কতা যদি দাঁতের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে, তাহলে একজন ডেন্টিস্টের কাছে যাওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। লালার অভাবে দাঁতে প্লাক জমে, মাড়ির রোগ বাড়ে এবং দাঁতের ক্ষয় দ্রুত হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন বিভাগে অভিজ্ঞ ডেন্টিস্ট পাওয়া যায়, যারা এই বিষয়ে সঠিক পরামর্শ ও চিকিৎসা দিতে পারেন।

নিচের টেবিলটি দেখুন—সাধারণ ও গুরুতর কারণের পার্থক্য বোঝা সহজ হবে:

মুখ শুষ্কতার সাধারণ ও গুরুতর কারণের পার্থক্য
কারণের ধরন উদাহরণ আপনার করণীয়
সাধারণ (অস্থায়ী) পানিশূন্যতা, অতিরিক্ত চা-কফি, ধূমপান, মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া পানি পান বাড়ান, অভ্যাস পরিবর্তন করুন, কিছু দিনের মধ্যেই ঠিক হয়ে যাবে
ওষুধজনিত অ্যান্টিহিস্টামিন, ডায়ুরেটিক, এন্টিডিপ্রেসেন্ট চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করবেন না; ডাক্তারকে জানিয়ে বিকল্প ওষুধের সম্ভাবনা দেখুন
রোগজনিত (মারাত্মক হতে পারে) ডায়াবেটিস, সজোগ্রেন সিনড্রোম, থাইরয়েড, স্নায়বিক রোগ রক্ত পরীক্ষা ও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন; অন্তর্নিহিত রোগের চিকিৎসা শুরু করুন

বিভাগ অনুযায়ী ডেন্টিস্ট ও ডেন্টাল ক্লিনিক

মুখ শুষ্কতার কারণে দাঁত ও মাড়ির সমস্যা দেখা দিলে একজন দক্ষ ডেন্টিস্টের সাহায্য নেওয়া ভালো। নিচে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিভাগে ডেন্টিস্ট ও ডেন্টাল ক্লিনিকের তালিকা দেওয়া হলো:

বিভাগ ডেন্টাল তালিকা
Dhaka ঢাকার যাচাইকৃত ডেন্টিস্ট
Chattogram চট্টগ্রামের জনপ্রিয় ডেন্টিস্ট
Khulna খুলনার যাচাইকৃত ডেন্টিস্ট
Rajshahi রাজশাহীর জনপ্রিয় ডেন্টিস্ট
Rangpur রংপুরের যাচাইকৃত ডেন্টিস্ট
Sylhet সিলেটের ডেন্টিস্ট
Barishal বরিশালের ডেন্টিস্ট
Mymensingh ময়মনসিংহের দাঁতের ডাক্তার

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

মুখ শুকিয়ে গেলে ঘরোয়া উপায়ে কী করা যেতে পারে?

মুখ শুষ্ক হলে কিছু ঘরোয়া উপায়ে স্বস্তি পাওয়া যায়। যেমন: সারাদিনে পর্যাপ্ত পানি পান করা, মুখে বারবার সামান্য পানি নেওয়া, চিনি ছাড়া লেবু পানি খাওয়া, এবং পান বা জর্দা জাতীয় মশলা এড়িয়ে চলা। তবে মনে রাখবেন, এসব ঘরোয়া পদ্ধতি সমস্যার মূল কারণ দূর করে না। যদি দীর্ঘদিন ধরে মুখ শুকিয়ে থাকে, তবে এটি কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা ডায়াবেটিসের মতো অন্তর্নিহিত রোগের লক্ষণ হতে পারে। সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

মুখের শুষ্কতা কি ডায়াবেটিসের লক্ষণ হতে পারে?

হ্যাঁ, ডায়াবেটিস (বিশেষ করে টাইপ ২) মুখের শুষ্কতার একটি সাধারণ কারণ। রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে গেলে শরীর বেশি পানি বের করে দেয়, যার ফলে লালা কম হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, ডায়াবেটিস রোগীদের প্রায়ই মুখ শুকিয়ে যাওয়ার অভিযোগ থাকে। তাই যদি আপনার তৃষ্ণা বেশি লাগে, ঘন ঘন প্রস্রাব হয় আর মুখ শুষ্ক থাকে, তাহলে রক্তের সুগার পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া ভালো। তবে মুখ শুষ্কতার আরও অনেক কারণ থাকে, তাই শুধু এটির ভিত্তিতে ডায়াবেটিস ধরে নেওয়া ঠিক নয়। সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।

ধূমপান বা জর্দা, পান মশলা খেলে মুখ শুকিয়ে যায় কি?

অবশ্যই। বাংলাদেশে ধূমপান, জর্দা, সাদা পাতা, পান মশলা ইত্যাদি ব্যবহারের প্রবণতা বেশি। এসবের মধ্যে থাকা নিকোটিন ও অন্যান্য রাসায়নিক লালা গ্রন্থির কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং মুখের আর্দ্রতা নষ্ট করে। নিয়মিত এসব অভ্যাস থাকলে মুখ শুষ্ক হওয়া ছাড়াও দাঁতের ক্ষয়, মাড়ির সমস্যা এমনকি ওরাল ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়ে। অভ্যাসগুলো নিয়ন্ত্রণ করা বা পুরোপুরি ছেড়ে দিলে মুখের শুষ্কতা অনেকটাই কমতে পারে। তবে যদি দীর্ঘদিন ধরে মুখ শুকিয়ে থাকে, তাহলে একজন ডেন্টিস্ট বা মেডিসিন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

রাতে ঘুমানোর সময় মুখ শুকিয়ে যায় কেন এবং কী করণীয়?

রাতে মুখ শুকিয়ে যাওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে। যেমন মুখ খুলে ঘুমানো (নাক বন্ধ থাকলে বা অ্যাডিনয়েড সমস্যা থাকলে), ঘুমের মধ্যে নাক ডাকা, বা ঘরের বাতাস খুব শুষ্ক থাকা। এছাড়া কিছু ওষুধ যেমন অ্যালার্জির ওষুধ বা এন্টিডিপ্রেসেন্টও রাতে লালা কমিয়ে দিতে পারে। সমাধানের জন্য রুমে হিউমিডিফায়ার ব্যবহার করতে পারেন, বিছানার পাশে পানি রেখে দিতে পারেন, এবং প্রয়োজনে নাকের বন্ধভাব কমানোর ডাক্তারি পরামর্শ নিতে পারেন। যদি নিয়মিত রাতে ঘুম ভেঙে মুখ শুষ্ক লাগে, তাহলে ইএনটি বা ডেন্টিস্টের কাছে যাওয়া ভালো।

মুখের শুষ্কতা কি স্থায়ী হতে পারে? নাকি সাময়িক?

মুখের শুষ্কতা সাময়িক বা দীর্ঘস্থায়ী উভয়ই হতে পারে। সাময়িক কারণ যেমন ডিহাইড্রেশন, বেশি কথা বলা, বা মানসিক চাপ—এসব ঠিক হয়ে গেলেই স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরা যায়। কিন্তু কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, রেডিওথেরাপি, অটোইমিউন রোগ যেমন সজোগ্রেন’স সিনড্রোম, বা ডায়াবেটিসের মতো রোগের ফলে মুখের শুষ্কতা দীর্ঘস্থায়ী হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা নিলে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। স্থায়ী সমস্যা হিসেবে না ভেবে অন্তর্নিহিত কারণ খুঁজতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই উত্তম।

তথ্যসূত্র

উপরের তথ্যসূত্রগুলো আন্তর্জাতিক জার্নাল, সরকারি স্বাস্থ্য সংস্থা বা স্বীকৃত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া:

Rate this post